
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান বা সি-সেকশন। প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে সিজারের দিকে ঠেলে দেওয়ার পেছনে ক্লিনিকগুলোর বাণিজ্যিক মানসিকতা এবং সরকারি নজরদারির অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ২০২৫ সালেই দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।
২২ বছর বয়সী জেসমিন আক্তার (ছদ্মনাম) প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেন। চিকিৎসক তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সবকিছু স্বাভাবিক আছে। কিন্তু প্রসবের সময় হাসপাতালে নেওয়ার পর জানানো হয়, বাচ্চা বড় হয়ে গেছে এবং দেরি করলে ঝুঁকি বাড়বে। পরিবারের সম্মতিতে সিজার করা হয় এবং খরচ হয় ৭৭ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সন্তানের সময় তাকে বলা হয়, আগে সিজার হওয়ায় এবারও অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় নেই। জেসমিনের মতো এমন হাজারো মা আজ অপ্রয়োজনীয় সিজারের শিকার।
বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে:
অপ্রয়োজনীয় সিজার: প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শিশু জন্মেছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে।
বৈশ্বিক বনাম বাংলাদেশ: বিশ্বে প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ১ জন (২১%) সিজারে জন্ম নিলেও বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৪৫-৫২ শতাংশ।
বেসরকারি ক্লিনিকের অবস্থা: বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই হার আরও উদ্বেগজনক, যেখানে ১০টি শিশুর মধ্যে ৮-৯টিই (৮৫-৯০%) সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় সিজারের কারণে দেশে প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশাপাশি মা ও শিশুর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে:
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: স্বাভাবিক প্রসবে শিশুর শরীরে মায়ের উপকারী জীবাণু (মাইক্রোবায়োম) স্থানান্তরিত হয়, যা সিজারে সম্ভব হয় না।
মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব: সিজারের ফলে জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে শিশুর ‘স্কিন-টু-স্কিন’ কন্ট্যাক্ট বা স্পর্শ থেকে শিশু বঞ্চিত হয়।
ভয়ভীতি প্রদর্শন: স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে যন্ত্রণাদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রচার করায় মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, স্বাভাবিক প্রসবে সময়ের প্রয়োজন হয়, যা অনেক চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনরা দিতে চান না। এছাড়া অনেক বেসরকারি ক্লিনিকে দক্ষ জনবল বা মানসম্মত লেবার রুম নেই। ফলে দ্রুত মুনাফা লাভের আশায় অস্ত্রোপচারকেই সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। অথচ যথাযথ কাউন্সেলিং এবং লেবার মনিটরিং করলে এই হার ৩০-৪০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরণের গাফিলতি রয়েছে। দেশে বর্তমানে স্বাভাবিক প্রসবের হার কমে যাওয়া মায়েদের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি তদারকি ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন