এম.এইচ.বি, দৈনিক ফলাফল
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১:৪১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষাবিদের কলাম, পরিবারের খাবার টেবিল থেকে জীবনের পাঠ, লেখক: স্যার নাজির সাবরী

স্টাফ রিপোর্টার :
পরিবারের খাবারের টেবিল যে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, তা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। প্রতিদিনের খাবারের সময়টুকু হতে পারে সন্তানদের নৈতিকতা, শিষ্টাচার, মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন শেখানোর এক সুন্দর সুযোগ। দুঃখজনক হলেও সত্য, একসঙ্গে বসে খাওয়ার এই সুন্দর সংস্কৃতি দিন দিন আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যস্ত জীবন, প্রযুক্তিনির্ভরতা, মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও অনেক সময় একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারাচ্ছেন। অথচ একসঙ্গে খাওয়া মানে শুধু খাবার খাওয়া নয়। এটা কথা বলা, শোনা, শেখা আর ভালোবাসার সময়। যদি প্রতিদিন একবারও সবাই একসঙ্গে বসে খেতে পারে, তবে শিশুর মন শক্ত হয়, ভাষা সুন্দর হয়, আর স্বপ্ন দেখার সাহস বাড়ে। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া দাওয়া শুধু শরীরের পুষ্টি দেয় না, এটি মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিশুরা বিদ্যালয়ে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে পরিবার থেকে। একটি পরিবারে খাবার টেবিল শুধু খাওয়ার জায়গা নয়, এটি হলো দিনের সবচেয়ে আন্তরিক সময়। এখানে সবাই একত্র হয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়।

শিশুদের জন্য এই পরিবেশ অত্যন্ত নিরাপদ। তারা জানে, এখানে তাদের কথা কেউ কেটে দেবে না, উপহাস করবে না। এই নিরাপত্তাবোধই তাদের মানসিক বিকাশের প্রথম শর্ত। পরিবারের বড়রা যখন নিজেদের অভিজ্ঞতা শোনান, তখন শিশুরা জীবনের বাস্তব পাঠ পায়। এই অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা তাদের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। গবেষকদের মতে, একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া শিশুদের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা গড়ে তোলে। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়ায় শিশুরা আবেগ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী হয়। সারাদিনের ক্লান্তি, আনন্দ বা হতাশা তারা পরিবারের কাছে প্রকাশ করতে পারে, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, এটি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। খাবার টেবিলে কথোপকথন শিশুদের ভাষাগত ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিনের কথাবার্তায় তারা নতুন শব্দ শেখে, যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শেখে এবং অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলে। এই দক্ষতাগুলো সরাসরি পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশেও সাহায্য করে।

আজকের শিক্ষার্থীরা প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। ভালো ফল করতে হবে, সেরা হতে হবে এই চাপ তাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। কোচিং, অ্যাসাইনমেন্ট, সহশিক্ষা কার্যক্রম সব মিলিয়ে তারা প্রায় সারাক্ষণই ব্যস্ত। এই বাস্তবতায় খাবার টেবিল হয়ে ওঠে তাদের দম ফেলার জায়গা, একটি চাপমুক্ত স্থান । এখানে কেউ নম্বর জানতে চায় না, কেউ তুলনা করে না। বরং তারা পায় মানসিক সমর্থন ও পারিবারিক উষ্ণতা। এই স্বস্তিই শেখার আগ্রহ বাড়ায়।

খাবার টেবিলে আলোচনার সুযোগ শিশুকে শেখায় চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে। স্কুল, বন্ধু বা পরিবারের বিষয় নিয়ে আলোচনা তাদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এমন অভ্যাস শিশুকে পরীক্ষার খাতা, প্রেজেন্টেশন এবং ভবিষ্যতের পেশাগত জীবনে সাহায্য করে।

খাবার টেবিলে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। স্কুলে কী শিখল, বন্ধুর সঙ্গে কী সমস্যা হলো, ভবিষ্যতে কী হতে চায়—এসব বিষয় নিয়ে স্বাভাবিক কথাবার্তা চলে। এতে শিশুরা প্রশ্ন করতে শেখে, নিজের মত প্রকাশ করতে শেখে। এই আলোচনাগুলো তাদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়। তারা ধীরে ধীরে শিখে যায়, কীভাবে চিন্তা বিশ্লেষণ করতে হয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব গুণই ভবিষ্যতে তাদের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত জীবনে এগিয়ে দেয়।

আমাদের সমাজের অনেক মেধাবী মানুষ জীবনে পিছিয়ে পড়ে শুধু নিজের চিন্তা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পারার কারণে। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ পায়, তবে সে শিখে যায় কীভাবে গুছিয়ে নিজের ভাবনা উপস্থাপন করতে হয়। খাবার টেবিল সেই নিরাপদ জায়গা, যেখানে ভুল বললেও ভয় নেই। এই অভ্যাস ভবিষ্যতে পরীক্ষার উত্তর লেখা, প্রেজেন্টেশন দেওয়া কিংবা চাকরির সাক্ষাৎকারে বড় ভূমিকা রাখে।

একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে । এটি শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং একটি নীরব শিক্ষার মাধ্যম। এই টেবিলেই শিশু শেখে কীভাবে অন্যের কথা শুনতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, নিজের কথা সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে হয় এবং কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। প্রতিটি খাবারের সময় যেন ছোট্ট একটি শিক্ষালয়, যেখানে ভালোবাসা, শিষ্টাচার ও সহমর্মিতা অজান্তেই হৃদয়ে গেঁথে যায়।

এই অভ্যাস শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা দেয়। তারা অনুভব করে—“আমি একা নই, আমার পরিবার আমার পাশে আছে।” ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শক্ত হয় এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা ভেঙে পড়ে না। পরিবারে একসঙ্গে খাওয়ার সময় গল্প, হাসি, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি—এসবই শিশুর চিন্তাশক্তি ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে সমৃদ্ধ করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই শিশু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখে।

কিন্তু আমরা যদি সচেতন হই, তাহলে খাবারের টেবিলকে আবারও পরিবারের ভালোবাসা, শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চার একটি প্রাণবন্ত স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। কারণ একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই, আর সেই শিক্ষার অন্যতম সুন্দর জায়গা হতে পারে পরিবারের একসঙ্গে খাওয়ার টেবিল। তাই আজকের ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন সম্ভব না হলেও, সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
মোবাইল ফোন, টিভি দূরে রেখে কিছু সময় শুধু পরিবারের জন্য রাখা—এটাই হতে পারে সম্পর্ককে গভীর করার সহজ কিন্তু কার্যকর উপায়। একটি সাধারণ অভ্যাস—পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া—শিশুর ভবিষ্যতের জন্য এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিনিয়োগ। কারণ এই টেবিলেই তৈরি হয় আগামী দিনের সচেতন, সহানুভূতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ।

লেখক: নাজির সাবরী
একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর: আল ইহসান একাডেমি
প্রতিষ্ঠাতা: স্কিল লার্নিং
ই-মেইল: sabrisstsbd@gmail.com

দৈনিক ফলাফল
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
মতামত

শিক্ষাবিদের কলাম, পরিবারের খাবার টেবিল থেকে জীবনের পাঠ, লেখক: স্যার নাজির সাবরী

প্রতিষ্ঠাতা : শেখ মোস্তাফিজুর রহমানdainikfalafal.net

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বন্ধক রেখে ১১৫ উত্তর কাফরুল বাড়ির মালিক টমাস সুব্রত হালদার অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ উঠেছে

১

আইডব্লিউসি ঢাকা সানরাইজের উদ্যোগে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উদযাপিত

২

খুলনা নিরালায় সিগারেট কোম্পানির কর্মীকে গুলি করে ব্যাগ ছিনতাই

৩

সঙ্গীত শিল্পী জামাল উদ্দিন নাছির-এর মাতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন

৪

নারায়ণগঞ্জে সেপ্টেম্বর মাসের ‘শ্রেষ্ঠ এএসআই’ নির্বাচিত হলেন মোঃ হামিদ খান

৫

ফতুল্লায় চার কেজি গাঁজাসহ নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

৬

বিতর্কিত মিষ্টির বিদায়ের পর সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির নতুন মুখ এলিজা জামান

৭

দেশ গঠনে তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার আহ্বান চিফ হুইপের

৮

কলকাতার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন সমিতির ‘ওয়ার্ল্ড সম্মাননা’ পেলেন সাংবাদিক আওরঙ্গজেব কামাল

৯

মানিকগঞ্জে জমির নামজারিতে অনিয়মের অভিযোগ, ১৮ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ

১০

মাগুরায় সোহাগ পরিবহনে হামলা, সুপারভাইজারসহ আহত ৪

১১

খুলনা ডুমুরিয়ায় লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা ক্যাপিটাল গার্ডেনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্পন্ন

১২

খুলনা ​ডুমুরিয়ায় বিশিষ্ট কবি ও গবেষক লায়ন শেখ মনিরুজ্জামানকে সম্মানসূচক ‘লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল ম্যাগাজিন’ প্রদান

১৩

ইফতেখার আলম বাবু’র দ্রুত রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

১৪

অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের সেবায় লায়ন সদস্যদের এগিয়ে আসার আহ্বান ….লায়ন শেখ মোস্তাফিজুর রহমান

১৫

পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে লায়ন্স ক্লাবের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

১৬

রাজপথ থেকে জনমনে আস্থার নাম মোস্তফা জামান

১৭

আজ চল্লিশা

১৮

বৃহত্তর খুলনা সমিতি, ঢাকার কার্যনির্বাহী পরিষদের ২১তম জরুরি সভা অনুষ্ঠিত

১৯

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান রফিক, আলোচনায় নতুন মুখ

২০