
এম মুরশীদ আলী : অন্যায়, অত্যাচার ও আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সমাজে সত্য, ন্যায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠাই দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের মূল দর্শন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, সমগ্র স্বর্গ ও মর্ত্য জুড়ে অসুররাজ মহিষাসুরের পৈশাচিক তাণ্ডব থেকে দেবকুল ও মানবজাতিকে রক্ষা করতে মহাশক্তি আদ্যাশক্তি মহামায়ারূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবী দুর্গা। দশহাতে দশ প্রকার অস্ত্র নিয়ে অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করে তিনি জগতে শুভ শক্তির চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেন। জগতের সার্বিক মঙ্গল সাধন, জীবের সংকট মোচন এবং মানবজাতির জীবনে শান্তি ও কল্যাণের বার্তা পৌঁছে দিতেই প্রতি বছর শরৎকালে দেবী মর্ত্যধামে আসেন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, এবার জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং তিনি স্বর্গলোকে প্রস্থান করবেন নৌকায়। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী দেবীর এই আগমন ও গমনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মূলত দশ দিনের ধর্মীয় আচার হলেও শেষ পাঁচ দিন—ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী—দুর্গোৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এ বছর শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। ষষ্ঠীর দিন সকালে দেবীর মুখ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়; যেখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশসহ সপরিবারে দেবীদুর্গা মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হন। একইসঙ্গে দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদকে (নবপত্রিকা) স্নান করিয়ে পূজা করা হয়। অঞ্জলি প্রদান, আরতি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। এরপর বিজয়া দশমীর বিহিত পূজা ও প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে এই মহোৎসবের।
জাতীয় পর্যায়ে এ বছর শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে। সারাদেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে। সরকারি অনুদানও ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করায় সাপ্তাহিক ছুটিসহ মোট পাঁচ দিনের (২০ থেকে ২৪ অক্টোবর) টানা ছুটির সুযোগ তৈরি হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রূপসা উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে বইছে উৎসবের আমেজ। উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মোট ৭৬টি মণ্ডপে এবার পূজা উদযাপিত হচ্ছে। ইউনিয়নভিত্তিক হিসাবে—ঘাটভোগ ইউনিয়নে সর্বাধিক ৩৫টি, নৈহাটী ইউনিয়নে ১২টি, আইচগাতী ইউনিয়নে ১১টি, টিএসবি ইউনিয়নে ১১টি এবং শ্রীফলতলা ইউনিয়নে ৭টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শাস্ত্রীয় তাৎপর্য তুলে ধরে রূপসা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শক্তিপদ বসু বলেন, “শাস্ত্র মতে দেবীর গজে (হাতি) আগমন অত্যন্ত শুভ এবং দোলা বা পালকিতে গমন অশুভ বার্তা বহন করে। এবার দেবীর ঘোটকে আগমন ও নৌকায় গমন শাস্ত্রমতে বিশেষ ফলদায়ক।”
পূজার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণ গোপাল সেন জানান, উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব মন্দিরে নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা কম, সেগুলোতে বিশেষ নৈশকালীন পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রতিটি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে একটি মনিটরিং সেল ও ভ্রাম্যমাণ টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সকল সম্প্রদায়ের আন্তরিক সহযোগিতায় রূপসায় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা অজিত কুমার ঘোষ জানান, রূপসার অধিক গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি মন্দিরে ৮ জন করে (১ জন প্লাটুন কমান্ডার, ১ জন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার, ৪ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সদস্য) এবং সাধারণ মন্দিরগুলোতে ৬ জন করে (১ জন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার, ৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সদস্য) আনসার-ভিডিপি সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সদস্যদের কঠোর প্রহর ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ব্রিফিং প্রদান করা হয়েছে।
রূপসা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার জাহিদ আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে বলেন শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আনসার বাহিনীর সাথে সাথে পুলিশ বাহিনী এবং সাদা পোশাকের পুলিশ বাহিনী ও কর্তব্য পালন করবে এবং উপজেলা পুলিশ ও জেলা পুলিশের ভ্রাম্যমান টিম ও থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সানজিদা রিক্তা বলেন, “দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সেজন্য প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আনসার-ভিডিপি ও নিয়মিত টহল পুলিশের পাশাপাশি র্যাবের ভ্রাম্যমাণ টিম এবং সেনাবাহিনী মাঠে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে।” ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলনমেলায় রূপসা উপজেলাসহ দেশজুড়ে শারদীয় দুর্গোৎসব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় প্রশাসনের।

মন্তব্য করুন